বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ০২:২২ অপরাহ্ন
নিউজ ডেস্ক, ইউনিভার্সেল নিউজ টোয়েন্টফোর ডট কম : পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলায় করতোয়া নদীতে তীর্থযাত্রীদের নৌকাডুবি ও একসঙ্গে এত মানুষের প্রাণহানি কিভাবে ঘটল? করতোয়া নদীতে নৌকাডুবির ঘটনায় এ পর্যন্ত অর্ধশত মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। অতীতে এমন নৌকাডুবি ও একসঙ্গে এত মানুষের প্রাণহানি দেখেনি পঞ্চগড়বাসী। তীর্থযাত্রীদের নৌকাডুবি দুর্ঘটনায় এত মানুষের প্রাণহানির দায় কার?
মহালয়ার পূজায় ওপারে বদেশ্বরী মন্দিরে যাতায়াতের জন্য ওই দিন দুটি নৌকা দেওয়া হয়। এর মধ্যে আবার একটা ছোট ছিল। কিন্তু এত লোকের চাপ ছিল যে, ওই নৌকায় মানুষের জায়গা ছিল না। পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, গ্রাম পুলিশ মাইকে অতিরিক্ত মানুষ উঠতে নিষেধও করছিল। মানুষের চাপ সামাল দেওয়া যায় নাই। নৌকায় একশ’র বেশি লোক উঠছিল। নৌকায় অতিরিক্ত মানুষ উঠছে তখন ঘাটে নৌকা ডুবু ডুবু ছিল। ওই অবস্থায় নৌকা ছেড়ে দেওয়ায় এত প্রাণহানি ঘটনা ঘটছে।
মহালয়া উপলক্ষে মানুষের চাপ হবে, এটা সবার জানা। কিন্তু চাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য বাঁশের ব্যারিকেডের ব্যবস্থা ছিল না। আবার এত মানুষের জন্য বড় নৌকা ছিল মাত্র একটি। ওই নৌকায় মাড়েয়া ইউপি চেয়ারম্যানও উঠেছিলেন। কিন্তু অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে তিনি পরে নেমে যান। মন্দির পূজা উদযাপন ঘাট ইজারাদারের সঙ্গে বসে মহালয়ার দিন নৌকার সংখ্যা বাড়ানোর জন্য অনুরোধ করেছিল। অন্তত ছয়টি নৌকার ব্যবস্থা রাখার জন্য বলা হয়েছিল। কিন্তু তারা সেটা করেননি বলে
ভক্তরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। ভক্তদের ক্ষোভ প্রতি বছর এই সময় ঘাটে প্রচণ্ড ভিড় হয়। কিন্তু ভিড় সামলানোর জন্য কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। যার ফলে এহেন গাফিলাতিতে এত প্রাণহানি ঘটল।
প্রতক্ষদর্শীদের ভাষ্য, নৌকা ছাড়ার আগেই ডুবুডুবু ছিল। মাঝি নৌকা নিয়ে নদীর মাঝামাঝি পৌঁছে যায়। তখন নৌকা এদিক ওদিক টলছিল। এ সময় মাঝি নৌকা ঘুরিয়ে আবার ঘাটে ফেরার চেষ্টা করেন। নৌকাটি জোরে ঘোরাতে গিয়ে একদিকে কাত হয়ে উল্টে যায়। মানষের ওপর মানুষ পড়ে গিয়ে বেশিরভাগ মানুষ ডুবে যায়। অনেকে সাঁতরে নদী তীরে ওঠে।
রোববার (২৫ সেপ্টেম্বর) মহালয়া উপলক্ষে জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা সনাতন ধর্মাবলম্বীরা নৌকায় করে বোদা উপজেলার বরদেশ্বরী মন্দিরে যাচ্ছিলেন উৎসবে যোগ দিতে। দুপুরের দিকে মাড়েয়া বামনহাট ইউনিয়নের আউলিয়া ঘাট এলাকায় একটি নৌকা উল্টে যায়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, নৌকাটিতে দেড় শতাধিক যাত্রী ছিল। কিছু মানুষ সাঁতরে নদীর তীরে ফিরতে পারলেও অনেকে নিখোঁজ থাকেন। নৌকাডুবির পরপরই স্থানীয়রা নৌকা নিয়ে উদ্ধার কাজ শুরু করেন। পরে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা নামেন তল্লাশিতে।
পঞ্চগড় ফায়ার সার্ভিসের উপ-সহকারী পরিচালক শেখ মাহবুব ইসলাম জানান, রোববার ২৫ জনের লাশ উদ্ধারের পর রাতে নদীতে তল্লাশি সাময়িক বন্ধ রাখা হয়েছিল, সোমবার ভোর সাড়ে ৫টায় নতুন করে উদ্ধার অভিযান শুরু হয়। রাজশাহী, রংপুর ও কুড়িগ্রাম থেকে আসা ডুবুরি দলও এখন অভিযানে অংশ নিচ্ছেন।
সকালে করতোয়া এবং পাশের দিনাজপুরের আত্রাই নদীর বিভিন্ন স্থানে মরদেহ ভেসে উঠলে স্থানীয়রা পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেয়। পরে মরদেহগুলো উদ্ধার করা হয় বলে জানান ফায়ার সার্ভিসের এ কর্মকর্তা।
নিহতদের স্বজনরা করতোয়া নদীর পাড়ে প্রিয়জনের লাশের জন্য অপেক্ষা করছেন। তাদের আহাজারিতে সেখানে এক হৃদয়বিদারক অবস্থা তৈরি হয়েছে। প্রায় ২৪ ঘণ্টা পরেও লাশ না পেয়ে অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
বোদা থানার ওসি সুজয় কুমার রায় বলেন, “ধারণা করা হচ্ছে, স্রোতের টানে হয়তো অনেক লাশ আশপাশের নদীতে ভেসে গেছে। পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস সেই বিষয়টি মাথায় রেখেই তল্লাশি অভিযান পরিচালনা করছে। বোদা উপজেলার পাশেই দেবীগঞ্জ উপজেলা; তার পরেই দিনাজপুরের খানসামা উপজেলা। সোমবার সেখান থেকে সাতটি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।”
পুলিশ নিখোঁজদের উদ্ধার করে স্বজনদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছে বলেও জানান ওসি।
হিমালয়ের পাদদেশ থেকে আসা করতোয়া নদী উপজেলার মাড়েয়া বামনহাট ইউনিয়নের আউলিয়া ঘাট এলাকায় এমনিতে খুব খরস্রোতা নয়; গভীরতাও খুব বেশি নয়। কিন্তু গত দুদিনের টানা বর্ষণের পর উজানের ঢলে নদীতে পানি বেড়েছে অনেকটা। এর মধ্যে দুর্ঘটনায় পড়া নৌকায় ধারণ ক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি যাত্রী ওঠায় এবং মাঝ নদীতে নৌকাডুবির কারণে মৃত্যু এত বেশি হয়েছে বলে মনে করছে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা। নৌকা ডুবির ঘটনার সময় মাড়েয়া ঘাটের পাড়েই ছিলেন স্থানীয় বাসিন্দা আজম। তিনি ঘাট থেকে ছেড়ে যাওয়া নৌকাটি ডুবে যেতে দেখেছেন। তিনি বলেন, “এই ঘাটে অনেক লোকজন পারাপার হয়। পূজা উপলক্ষে এখন হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রচুর লোকজন পার হচ্ছে। এর মধ্যে আজকে হঠাৎ নৌকা ডুবে গিয়ে অনেক লোকজন মারা গেছে। আমি ১৬-১৭টা লাশ উঠতে দেখছি।”
নিহতদের মধ্যে উপজেলার রয়েছেন মাড়েয়া গ্রামের হেমন্তের মেয়ে পলি রানী (১৪), নির্মল চন্দ্রের স্ত্রী শোভা রানী, শালডাঙ্গা খালপাড়ের কার্তিকের স্ত্রী লজ্জা রানী (২৫), দেবীগঞ্জের শালডাঙ্গা হাতিডোবা গ্রামের বাবুল চন্দ্র রায়ের ছেলে দিপংকর (৩), পশ্চিম শিকারপুর গ্রামের কালীকান্তর ছেলে অমল চন্দ্র (৩৫), বোদার মাড়েয়া বামনপাড়ার সজিবের আড়াই বছর বয়সী ছেলে পিয়ন্ত, মহানন্দর স্ত্রী খুকি রানী (৩৫), দেবীগঞ্জের ডাঙ্গাপাড়া গ্রামের চণ্ডী প্রসাদের স্ত্রী প্রমিলা রানী (৫৫), দেবীগঞ্জের হাতিডোবার শিকারপুর গ্রামের রবিনের স্ত্রী তারা রানী (২৪), পাঁচপীর বংশীধর পূজারী গ্রামের প্রয়াত ভুড়া মহনের স্ত্রী শোনেকা রানী (৬০), বোদার মাড়েয়া শিকারপুর প্রধান পাড়া গ্রামের শ্রী মণ্টুর স্ত্রী কাঞ্জুনি রানী (৫৫), পাঁচপীর জয়নন্দ্র বজয়া গ্রামের মহানন্দ মাস্টারের মা প্রমীলা (৭০), দেবীগঞ্জ তেলিপাড়া গ্রামের প্রয়াত কলিন্দ্রনাথের স্ত্রী ধনো বালা (৪৭), পাচঁপীর বংশীধর গ্রামের রথেশ চন্দ্রের স্ত্রী সুমিত্রা রানী (৫৭), ময়দানদিঘীর চকপাড়া গ্রামের বিলাস চন্দ্রের স্ত্রী সফলতা রানী (৪০), বোদা উপজেলার মাড়েয়া বাসনহাট গ্রামের রমেশের স্ত্রী শিমলা রানী (৩৫), বোদা উপজেলার বড়শশী কুমারপাড়া গ্রামের হাচান আলী (৫২), একই উপজেলার আলোকপাড়া গ্রামের রমেশের শিশু কন্যা উশোশী, দেবীগঞ্জের হাতিডোবার নারায়নের শিশু কন্যা তনুশী, পাঁচপীর মদনহার গ্রামের রতন চন্দ্রের শিশু কন্যা শ্রেয়শী।
© All rights reserved ©2022-2026 universalnews24.comDesign By Ahmed Jalal.
Leave a Reply